বোধহয় আপনিও এই ফাঁদে পড়ে গেছেন! আপনার বাচ্চাকে একটা "ভালো" স্কুলে ভর্তি করিয়ে এখন বুঝতে পারছেন না, ঠিক কী করবেন। মনে হচ্ছে কোথাও একটা ভুল হচ্ছে, কিন্তু ধরতে পারছেন না সমস্যাটা ঠিক কোথায়।
চলুন, মিলিয়ে দেখি—সমস্যাটা আসলে কোথায় লুকিয়ে আছে।
আজকের প্রজন্মের যাঁরা শিক্ষিত বাবা-মা, তাঁদের অনেকেরই ছোটবেলার স্কুলজীবন কেটেছে মফস্বলের একেবারে সাধারণ বাংলা মাধ্যম স্কুলে। আমার নিজের কথাই বলি—আমি ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত পড়েছি তারকেশ্বর হাই স্কুলে, যেটা একেবারে সাধারণ একটা বাংলা বোর্ডের স্কুল। এই বছর স্কুলটির শতবার্ষিকী পালিত হলো। চোখে পড়লো, শত শত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, গবেষক—সবার শিকড় এই সাধারণ স্কুলেই।
শুধু তারকেশ্বর নয়, আপনি যদি একশো বছরের পুরোনো যেকোনো বাংলা মাধ্যম স্কুলের এলুমনি তালিকা দেখেন, একই ছবি চোখে পড়বে। কিন্তু আজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অনেকে ভাবেন, "এই স্কুলে আমার সন্তান পড়লে কীই বা হবে?" এই ভাবনাটা আসলে অমূলক নয়, কারণ সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু দুঃখের বিষয়—এই স্কুলগুলোর অনেক কিছুই বদলায়নি।
তার উপর আজ পশ্চিমবঙ্গের বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোর দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, আর শিক্ষার মান নিয়ে তো নতুন করে বলার কিছু নেই। এখন এই স্কুলগুলোর হাতে সন্তানের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেওয়া যেন সরাসরি সাপের হাতে ব্যাঙ তুলে দেওয়ার মতো।
তাহলে উপায় কী?
নিশ্চয়ই ভালো ইংরেজি মাধ্যম প্রাইভেট স্কুল। সেখানে অন্তত মাস স্কেলে ঘুষ দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ হয় না। কিন্তু এখানেই তো আসল বিপত্তি শুরু।
ভুল ১: বাড়ি থেকে অনেক দূরের স্কুলে ভর্তি করানো
অনেকেই ভাবেন, “ভালো স্কুল তো বাড়ির কাছে নেই, একটু দূরে হলেও চলবে।” কিন্তু আপনার বাচ্চা প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে স্কুলে যেতে ও আসতে দুই ঘণ্টা বাসে কাটাচ্ছে—মানে আপনার নিজের চার ঘণ্টার অফিস যাত্রার মতোই ক্লান্তিকর অভিজ্ঞতা ওর জন্য। আপনি অফিস থেকে ফিরে পড়তে বসলে মন দিতে পারেন? পারেন না। আপনার বাচ্চাও পারে না। শুধু বাসে যাওয়া-আসা করেই ওর পড়াশোনার শক্তি শেষ হয়ে যায়।
তাই যেটা বলছি, তা হল—যদি সম্ভব হয়, সেই ভালো স্কুলের কাছেই বাড়ি নিয়ে যান, অথবা কাছাকাছি একটু কম ভালো স্কুলে ভর্তি করান। কিন্তু বাচ্চাকে বাস জার্নির ক্লান্তিতে ফেলবেন না।
ভুল ২: বাচ্চাকে সব এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিতে জোর করে জড়িয়ে ফেলা
বাচ্চা স্কুলে যাচ্ছে, পড়ছে, আবার স্কুলের নানা অলিম্পিয়াড, অ্যাবাকাস, ড্রয়িং, নাচ, গান—সবকিছুতে গলা পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছে! এতে কিন্তু পড়াশোনার সময়-শক্তি, মনঃসংযোগ—সবই নষ্ট হচ্ছে।
এইসব অ্যাকটিভিটির আড়ালে কিন্তু বিশাল ব্যবসা লুকিয়ে আছে। অনেক স্কুল বাইরের অলিম্পিয়াড বা অ্যাবাকাস সংস্থার কাছ থেকে মোটা টাকা কমিশন পায়। স্কুল ১০০ জন বাচ্চাকে পাঠালে ১০ লাখ টাকা, ২০০ জন পাঠালে ১৫ লাখ—এই হিসেবেই চলছে পুরোটা। বাচ্চা একটু পারলেই পদক—কারণ না পেলে আপনি তো পরের বছর আর টাকা দেবেন না!
এর ফলে আপনার সন্তান শিখে যাচ্ছে—"কষ্ট না করেও পুরস্কার পাওয়া যায়"। এই মানসিকতা কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য ভয়ঙ্কর। এরপর ও বুঝবেই না সত্যিকারের অর্জন মানে কী।
তাই বলছি—প্রথমে বুঝুন, আপনার সন্তানের সত্যিকারের আগ্রহ কোন বিষয়ে। যদি গণিত ভালোবাসে, তবে ইনমো দিন। বিজ্ঞানে আগ্রহ থাকলে এনএসও দিন। সাইবার সিকিউরিটি পছন্দ হলে এনসিও দিন। এই আসল অলিম্পিয়াডগুলোর পদক সত্যিকারের গর্বের। সোশ্যাল মিডিয়ায় গর্ব করে পোস্ট করার মতো।
ভুল ৩: গাদা গাদা টিউশন
এটাই আজ সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রবণতা। বাচ্চাকে সকাল-সন্ধ্যা একের পর এক টিউশনে ঠেলে দিয়ে আমরা ভাবি ও খুব পড়ছে। কিন্তু বাস্তব হলো—সবটাই স্পুন-ফিডিং। টিউটর পড়িয়ে দিচ্ছেন না—একেবারে মুখে তুলে দিচ্ছেন, আর বাচ্চারা শুধু মুখস্থ করে পরীক্ষায় উগরে দিচ্ছে।
একবার পরীক্ষা করে দেখুন—আপনার বাচ্চা যদি ক্লাস সেভেনে পড়ে, তাহলে ক্লাস সিক্সের বই থেকে ১০টা প্রশ্ন করুন। ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই উত্তর দিতে পারবে না। কারণ নিজের থেকে কিছুই শেখেনি।
টিউশন দিন, কিন্তু বলেন যেন নিজে চিন্তা করে বুঝে নিতে শেখে। ক্লাস এইট পর্যন্ত আলাদা আলাদা সাবজেক্টে আলাদা টিচার দেবেন না—একজনই যথেষ্ট। এতে সময় বাঁচবে, মনোযোগ থাকবে, পড়াশোনায় আগ্রহ জন্মাবে।
ফ্রী টাইম ও খেলার গুরুত্ব
সবচেয়ে অবহেলিত কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস—ফ্রী টাইম। বাচ্চাকে খেলার সময় দিন, নিজে নিজে কিছু বানাতে দিন, বোর হোক, নতুন কিছু ভাবুক। ছোটবেলায় খেলনা বানানো থেকে যে কল্পনা-শক্তি জন্ম নেয়, সেটাই একদিন বড়ো হয়ে রকেট সায়েন্টিস্ট করে তোলে।
সৃষ্টিশীলতা, কল্পনা, বিশ্লেষণ—এসবই জন্মায় যখন শিশু নিজে থেকে ভাবতে শেখে।
রিট্বিক ঘটকের কথাই মনে রাখুন: “ভাবো, ভাবো... ভাবা প্র্যাকটিস করো”। আজ যদি ভাবা শেখেন না, কাল AI এসে সব কাজ নিয়ে যাবে—আপনার সন্তানের কিছুই করার থাকবে না।
উপসংহার:
আপনার সন্তানকে ভালো স্কুলে দিন—সেটা অবশ্যই দরকারি। কিন্তু অন্ধভাবে “ভালো”-র পিছনে ছোটার দরকার নেই। ওর আগ্রহ বুঝে, সময় বুঝে, স্বাভাবিক ছন্দে চলতে দিন। খেলতে দিন, ভাবতে দিন, প্রশ্ন করতে দিন।
এটাই ওর ভবিষ্যতের ভিত্তি।
এ লেখাটি আপনার সঙ্গে যদি সামান্যতমও রিলেট করে, তাহলে দয়া করে আপনার মতামত জানান কমেন্টে। এই বিষয়ে যত আলোচনা হবে, ততই আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারব।
Collected from: গাছপাঁকা | সাজিয়ে গুছিয়ে উপস্থাপনা: [The Knowledge Network]

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন